For Advertisement

বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট, খাতুনগঞ্জেও বাড়তি দাম

২ মে ২০২২, ৮:২৭:০৪

# কোনোক্রমেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না দর
# পাম অয়েলের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
# খুচরা বাজারে সংকট বোতলজাত সয়াবিনের

চট্টগ্রামের অভিজাতরা সাধারণত খুচরা বাজার করেন কাজির দেউড়ি কাঁচাবাজারে। এ বাজারে তুলনামূলক বেশি টাকা দিয়ে পণ্য কিনতে অভ্যস্ত ক্রেতারা। সেই বাজারে টাকা দিয়েও মিলছে না বোতলজাত সয়াবিন তেল। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছেন না। বড় কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিরা বলছেন, উপর মহল থেকে সাপ্লাই কম, এতে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। খাতুনগঞ্জেও সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না সয়াবিন তেল। এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

কাজির দেউড়ি বাজারের মুদি দোকানি মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন টাকা দিয়েও সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের বোতলে ৭৬০ টাকা দর লেখা থাকলেও বাধ্য হয়েই ৮শ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ এই তেল সংগ্রহ করতে খাটুনি করতে হচ্ছে অনেক বেশি। আবার যারা শুধু তেল কিনতে চাইছেন, তারা টাকা দিয়েও সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না। অন্য সওদা বিক্রির জন্য সয়াবিন তেলটা রাখতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, উৎপাদক কোম্পানিগুলো আগে চাওয়ার আগেই তেল দিয়ে যেতো। এখন অর্ডার নিয়ে গেলে চারদিন পর সরবরাহ দিচ্ছে। ১০টি চাইলে পাওয়া যাচ্ছে একটি। পাঁচ লিটারের বোতল প্রায় নেই বললেই চলে।

সয়াবিন তেলের মধ্যে বাজারে রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা বেশি। রিয়াজ উদ্দিন বাজারে রূপচাঁদার বিক্রয় প্রতিনিধি মো. ইকবাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের উপর (ঊর্ধ্বতন পর্যায়) থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেভাবে আমরা বাজার মনিটরিং করি। এখন উপর থেকেই আমাদের তেলের সাপ্লাই কম। সব কোম্পানিই সাপ্লাই কম দিচ্ছে। কেন সাপ্লাই কম, কখন সাপ্লাই বাড়বে সে বিষয়টি আমাদের জানা নেই। এগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখভাল করেন। আমাদের লেভেলে কোনো সিদ্ধান্ত থাকে না। আমাদের যত দেওয়া হয়, ততই আমরা দোকানিদের ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা করি।’

একই বক্তব্য ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের বিক্রয় প্রতিনিধি মো. ফারুকের। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোম্পানি থেকে তেল কম আসছে। মাসের প্রথমে স্বাভাবিক আসতো। এখন কমে গেছে। আমরা কম পাচ্ছি, কম বিক্রি করছি। কোম্পানির কাছে কেমন তেল আছে, কেন সাপ্লাইন দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়টি আমরা মোটেও জানি না।’

বর্তমানে বিক্রির টার্গেটও নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে বিক্রির টার্গেট দেওয়া হতো। এখন সাপ্লাই কম, টার্গেটও নেই। আগে কোম্পানি থেকে চাপে থাকতাম, এখন ক্লায়েন্টদের চাপে আছি।’

শুধু শহরে নয়, গ্রামের বাজারগুলোতেও এখন সয়াবিন তেল মিলছে না। যারা কিনছেন, তারা অধিক দামে কিনছেন। কর্ণফুলী উপজেলা শিকলবাহা মাস্টার হাট এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মাস্টার হাটে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা। বোতলজাত তেল ২শ টাকায়।’

এদিকে রমজানের আগে থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেল নিয়ে অস্থিরতা চলছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাতুনগঞ্জের বাজারে গত শনিবার ৬ হাজার ৪৫০ টাকা মণে পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে সয়াবিনের বাজার ছাড়িয়েছে মণপ্রতি ৭ হাজার ৩শ টাকা। অথচ প্রতিমণ পাম অয়েল পাঁচ হাজার ১৮০ টাকা করে প্রতিমণ সয়াবিন পাঁচ হাজার ৫শ ৫০ টাকা দর নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এর আগে ভোজ্যতেলের দামের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে সরকার ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে।

তাছাড়া সরকার বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৬০ টাকা ঘোষণা দিলেও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশনের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রতি লিটারে ৩০-৩৫ টাকা। গত ১৮ এপ্রিল প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছিল ১৫০-১৫৫ টাকায়। ২৮ এপ্রিল সেই সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৮৪-১৮৬ টাকা লিটারে। একইভাবে গত ১৮ এপ্রিল প্রতি লিটার পাম অয়েল বিক্রি হয়েছিল ১৪০-১৪৮ টাকায়। ২৮ এপ্রিল সেই পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ১৬৫-১৭০ টাকায়।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে বছরে ২০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। অথচ বছরের প্রথম ১০ মাসেই এরচেয়ে বেশি ভোজ্যতেল আমদানি করেছে দেশের আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২১-২০২২ অর্থবছরের গত ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে প্রায় ২৬ লাখ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। শেষ চার মাসে আমদানি হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টন ভোজ্যতেল। বেশিরভাই আমদানি করেছে দেশের শীর্ষ পাঁচ শিল্প গ্রুপ।

খাতুনগঞ্জের ডিও ব্যবসায়ী আবু তাহের জানান, সরকারি বাড়াবাড়ির কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমদানিকারক মিলারদের কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ মিলাররা বাজারে ডিও ছেড়ে আগেই টাকা তুলে নিয়েছে। রোজার শুরুতে যাদের হাতে ডিও ছিল ভোক্তার (জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর) অভিযানের কারণে তারা লোকসান গুনেছে। এখনতো পাম অয়েল সাড়ে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে সাত হাজার তিনশ টাকায়। এখনতো কোনো অভিযান হচ্ছে না।

১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারে ভোক্তা পর্যায়ে কোনো সুফল আসেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু টিসিবির লাইন থেকে যারা সয়াবিন তেল কিনেছেন, তারা কিছুটা সস্তায় কিনেছেন। খুচরা মুদি দোকান থেকে কম দামে কেউ সয়াবিন তেল কিনতে পারেননি। ঈদের পর এ বাজার আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে বলে আশংকা করছেন তিনি। তিনি বলেন, ছোট ব্যবসায়ী ও মুদি দোকানিদের জেল জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু যাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ সেই মিলারদের বিরুদ্ধেতো কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।

খাতুনগঞ্জের তেল-চিনির বড় ব্যবসায়ী আরএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলমগীর পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, বাজারে এখন কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। মিলাররা সরকারিদলে যেগুলো সাপ্লাই দিচ্ছেন, আমরা সেগুলোই বিক্রি করছি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে একেকদিন একেক দর হচ্ছে। প্রতিদিনই দর বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। সামনে কী হবে, কেউ বলতে পারবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাতুনগঞ্জের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, রপ্তানিকারী দেশ আর্জেন্টিনা সয়াবিন তেল রপ্তানি সীমিত করেছে। ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে মালয়েশিয়ান তেলের বাজারও বেড়ে গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, দেশের শীর্ষ আমদানিকারকরাই ভোজ্যতেল সংকটের কারসাজিতে জড়িত। ভোজ্যতেল আমদানি ও সরবরাহে সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সুযোগ নিচ্ছেন বেসরকারি আমদানিকারকরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পেট্রোলিয়াম জ্বালানি তেলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দর কম ছিল, তখন জ্বালানি তেল দেশে বেশি দামে বিক্রি হলেও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, ভোজ্যতেলের আমদানিতে সরকারের তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার ভোজ্যতেলের বাজার ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন সারাদেশের সব ভোজ্যতেল আমদানি করছেন। তারা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

তিনি এ সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে ভোজ্যতেল আমদানিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

For Advertisement

Unauthorized use of news, image, information, etc published by Protichhobi is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.

Comments: